• ঢাকা
  • বৃহঃস্পতিবার , ৯ জুলাই ২০২৬ , রাত ১১:৫৭
ব্রেকিং নিউজ
হোম / সারাদেশ

আলফাডাঙ্গায় যুবক হত্যা: প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ, আতঙ্কে এলাকাবাসী

রিপোর্টার : নিজেস্ব প্রতিনিধি
আলফাডাঙ্গায় যুবক হত্যা: প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ, আতঙ্কে এলাকাবাসী প্রিন্ট ভিউ

এস এম রবিউল ইসলাম রুবেল : ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামে পূর্বশত্রুতার জেরে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ পূর্বপাড়া এলাকায় উকিল শেখের বাড়ির সামনে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত সুমন শেখ ওই গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছেলে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়,  উপজেলার বড়ভাগ গ্রামের বাসিন্দা আলাউদ্দিন শেখের ছেলে মো. সুমন শেখকে দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে একটি কুয়ার ভেতরে ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কাশিয়ানী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ইতোমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিহতের পরিবারের দাবি, বড়ভাগ গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হোসাইন শেখের নেতৃত্বে কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সুমনের ওপর হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে গুরুতর আহত করার পর একটি কুয়ার মধ্যে ফেলে রেখে যায়।

নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। উঠানজুড়ে স্বজনদের কান্না, আর ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। এক কোণে বসে নিহত সুমন শেখের বাবা-মা মোবাইল ফোনে ছেলের বিভিন্ন সময়ের তোলা ছবিগুলো বারবার দেখছিলেন। প্রতিটি ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ বেয়ে ঝরছিল অশ্রু। কখনো ছবিতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, কখনো বুকের সঙ্গে ফোনটি চেপে ধরে বিলাপ করছিলেন।

মা শেফালী বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই ছবিগুলোই এখন আমার ছেলের স্মৃতি। আমার বুকের ধনকে যারা কেড়ে নিয়েছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। আমার ছেলেকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না।

পাশেই নির্বাক বসে ছিলেন বাবা। ছেলের ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বারবার চোখ মুছছিলেন। স্বজনরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সন্তানের শোকে ভেঙে পড়া বাবা-মায়ের আহাজারি থামছিল না। পরিবারের একটাই দাবি—হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

নিহতের ভাই শামীম বলেন, আমার ভাই হত্যার ১১ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল পুলিশ মাত্র একজনকে আটক করলো। আমরা চাই সকল আসামীকে দ্রুত আটক করে বিচার শুরু করা হোক। আমরা খুনিদের ফাঁসির দাবী জানাই।

অন্যদিকে, মামলার আসামিপক্ষের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, এ ঘটনায় প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বড়ভাগ গ্রামের আব্দুল আলীম শেখের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুরের চিহ্ন রয়েছে। তিনি দাবি করেন, তার প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া শাহাদাত শেখের বাড়িতেও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ১০টি গরু, ১৫টি ছাগল, ধান, চালসহ ঘরের বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আসামিপক্ষের সদস্যদের দাবি, প্রকৃত হত্যাকারীদের শাস্তি তারা চান। তবে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে এবং বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে। এতে নারী-পুরুষ ও শিশুরা আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

অভিযুক্ত হোসাইন শেখের মা বলেন, সুমনকে কে বা কারা হত্যা করেছে, তা আমরা জানি না। তারপরও আমার ছেলেসহ ১৭ জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলার পর আমাদের বাড়িসহ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। আমরা হত্যার সঠিক বিচার চাই। কিন্তু নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি ও বাড়িঘর ধ্বংস করারও বিচার হওয়া উচিত।

আসামিপক্ষ শাহাদাত শেখের স্ত্রী মর্জিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় ফার্নিচারের কাজ করেন এবং ছেলে চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করে। ঘটনার সময় তারা কেউ বাড়িতে ছিলেন না। তারপরও তাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। আমাদের বাড়ি ভেঙে ১০টি গরু, ১৫টি ছাগল, ধান-চালসহ ঘরের বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের না করে আমাদের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে মধুখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আজম খান বলেন, নিহতের ভাই বাদী হয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়টিও আমরা জেনেছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সবার প্রতি আমাদের আহ্বান, একটি অপরাধের বিচার নিজের হাতে তুলে নিয়ে আরেকটি অপরাধ করা থেকে বিরত থাকুন। আইন নিজের গতিতে চলবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক আসামিকে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয়

সারাদেশ

আরও পড়ুন